জাহাঙ্গীর বাদশা।। হলদিয়া।। পূর্ব মেদিনীপুর।।
চারপাশে যখন ধর্মের নামে বিভেদ তৈরি করার চেষ্টা চলছে, তখন পূর্ব মেদিনীপুরের বন্যাকবলিত এক এলাকা থেকে উঠে এল সম্প্রীতি ও মানবিকতার এক অনন্য ছবি।
নিজের বাড়িই যেখানে অতি বর্ষার জলে জলমগ্ন, সেখানেই নিজের ভবিষ্যতের জন্য জমানো টাকা খরচ করে বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ালেন হলদিয়ার ব্রজলালচকের তরুণী রুকাইয়া খাতুন।
রুকাইয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। আর যে এলাকায় তিনি ত্রাণ নিয়ে পৌঁছলেন, সেই বারাতলা গ্রামের অধিকাংশ পরিবার হিন্দু সম্প্রদায়ের।
কিন্তু রুকাইয়ার কাছে মানুষের পরিচয়ের আগে কোনও ধর্মের পরিচয় নেই। বিপদের সময় মানুষই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় পরিচয়।
কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে পূর্ব মেদিনীপুরের একাধিক এলাকায় তৈরি হয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। জল ঢুকেছে বহু গ্রামে ও বহু বাড়িতে। খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকটে পড়েছেন অসংখ্য মানুষ।
এই পরিস্থিতিতে নিজের বাড়িও যখন জলের তলায়, তখন নিজের ভবিষ্যতের জন্য জমানো সঞ্চয় থেকে অর্থ খরচ করে ত্রাণসামগ্রী কিনে নেন রুকাইয়া।
এরপর সুতাহাটা থানার অন্তর্গত বারাতলা গ্রামে পৌঁছে প্রায় ১৫০টি বন্যাদুর্গত পরিবারের হাতে তুলে দেন ত্রাণ।
মুড়ি, বিস্কুট-সহ শুকনো খাবার, মোমবাতি, মশা তাড়ানোর ধূপের পাশাপাশি এলাকার মা-বোনেদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিনও তুলে দেন তিনি।
এই উদ্যোগ শুধু কয়েকটি পরিবারের হাতে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক গভীর বার্তা।
ধর্মের নামে যখন মানুষকে আলাদা করার চেষ্টা চলছে, তখন রুকাইয়া যেন নিজের কাজের মাধ্যমে দেখিয়ে দিলেন—বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়াতে ধর্মের পরিচয় লাগে না, লাগে শুধু একটি মানবিক মন।
নিজের ঘর জলমগ্ন, নিজের ভবিষ্যতের সঞ্চয়ও খরচ হয়ে যাচ্ছে। তবুও অন্যের মুখে একটু স্বস্তির হাসি ফোটাতে পিছপা হননি এই তরুণী।
হয়তো রুকাইয়ার দেওয়া ত্রাণ খুব বড় কোনও সাহায্য নয়। কিন্তু তাঁর এই উদ্যোগের বার্তাটি অনেক বড়—
মানুষের বিপদে মানুষই পাশে দাঁড়াবে।
ধর্ম আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানবতা কখনও আলাদা নয়।
বন্যার জলে যখন চারপাশের বহু পরিচয় মুছে যায়, তখন রুকাইয়ার মতো মানুষেরাই মনে করিয়ে দেন—মানবতার কোনও ধর্ম হয় না।

0 মন্তব্যসমূহ